CWSA Set of 37 volumes
Writings in Bengali and Sanskrit Vol. 9 of CWSA 715 pages 2017 Edition
Bengali
 PDF   

Editions

ABOUT

All writings in Bengali and Sanskrit including brief works written for the newspaper 'Dharma' and 'Karakahini' - reminiscences of detention in Alipore Jail.

Writings in Bengali and Sanskrit

Sri Aurobindo symbol
Sri Aurobindo

All writings in Bengali and Sanskrit. Most of the pieces in Bengali were written by Sri Aurobindo in 1909 and 1910 for 'Dharma', a Calcutta weekly he edited at that time; the material consists chiefly of brief political, social and cultural works. His reminiscences of detention in Alipore Jail for one year ('Tales of Prison Life') are also included. There is also some correspondence with Bengali disciples living in his ashram. The Sanskrit works deal largely with philosophical and cultural themes. (This volume will be available both in the original languages and in a separate volume of English translations.)

The Complete Works of Sri Aurobindo (CWSA) Writings in Bengali and Sanskrit Vol. 9 715 pages 2017 Edition
Bengali
 PDF   

বাংলা রচনা




পত্রাবলী




বারিনকে লিখিত

পণ্ডিচেরী
April, 1920

স্নেহের বারিন,

তােমার তিনটী চিঠি পেয়েছি (তারপর আজ আর একটী), এই পৰ্য্যন্ত উত্তর লেখা হয়ে উঠে নি ৷ এই যে লিখতে বসেছি, সেটাও একটা miracle, কেন না আমার চিঠি লেখা হয় once in a blue moon, – বিশেষ বাঙ্গলায় লেখা, যাহা এই পাঁচ সাত বৎসরে একবারও করি নি ৷ শেষ করে যদি postএ দিতে পারি, তাহা হলেই miracleী সম্পূর্ণ হয় ৷

প্রথম তােমার যােগের কথা ৷ তুমি আমাকেই তােমার যােগের ভার দিতে চাও, আমিও নিতে রাজী, – তার অর্থ, যিনি আমাকে তােমাকে প্রকাশ্যেই হৌক, গােপনেই হৌক তাহার ভাগবতী শক্তি দ্বারা চালাচ্ছেন, তাকেই দেওয়া ৷ তবে এর এই ফল অবশ্যম্ভাবী জানবে যে তাহারই দত্ত আমার যােগপন্থা – যাহাকে পূর্ণযােগ বলি – সেই পন্থায় চলিতে হইবে ৷ আমরা যাহা আলিপুর জেলে কম, তােমার আণ্ডামান ভােগের সময় তুমি যাহা করেছ, এটী ঠিক তাহা নয় ৷ যা নিয়ে আরম্ভ করেছিলাম, লেলে যা দিয়েছিলেন, জেলে যা করেছি, সেটী ছিল পথ খোঁজার অবস্থা, এদিক ওদিক ঘুরে দেখা, পুরাতন সকল খণ্ড যােগের এটী ওটী ছোঁয়া তােলা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করা, এটার এক রকম পুরাে অনুভূতি পেয়ে ওটার পিছনে যাওয়া ৷ তাহার পর পণ্ডিচেরীতে এসে এই চঞ্চল অবস্থা কেটে গেল, অন্তৰ্য্যামী জগদ্গুরু আমাকে আমার পন্থার পূর্ণ নির্দেশ দিলেন, তাহার সম্পূর্ণ theory, যােগ শরীরের দশটী অঙ্গ ৷ এই দশ বৎসর ধরে তাহারই development করাচ্ছেন অনুভূতিতে, এখনও শেষ হয়নি ৷ আর দুই বৎসর লাগতে পারে ৷ আর যতদিন শেষ না হয়, বােধ হয় বাঙ্গালায় ফিরতে পারবাে না ৷ পণ্ডিচেরীই আমার যােগসিদ্ধির নির্দিষ্ট স্থল – অবশ্যই এক অঙ্গ ছাড়া, সেটা হচ্ছে কৰ্ম্ম ৷ আমার কৰ্ম্মের কেন্দ্র বঙ্গদেশ, যদিও আশা করি তার পরিধি হবে সমস্ত ভারত ও সমস্ত পৃথিবী ৷

যােগপন্থাটী কি, তাহা পরে লিখিব – অথবা তুমি যদি এখানে আস, তখনই সেই কথা হবে, এই সব বিষয়ে লেখা কথার চেয়ে মুখের কথা ভাল ৷ এখন এই মাত্র বলিতে পারি, যে পূর্ণ জ্ঞান, পূর্ণ কৰ্ম্ম ও পূর্ণ ভক্তির সামঞ্জস্য ও ঐক্যকে মানসিক ভূমির (level) উপরে তুলিয়া মনের অতীত বিজ্ঞানভূমিতে পূর্ণ সিদ্ধ করা হচ্ছে তাহার মূল তত্ত্ব ৷ পুরাতন যােগের দোষ এই ছিল যে সে মনবুদ্ধিকে জানত আর আত্মাকে জানত, মনের মধ্যেই অধ্যাত্ম অনুভূতি পেয়ে সন্তুষ্ট থাকত, কিন্তু মন খণ্ডকেই আয়ত্ত করিতে পারে, অনন্ত অখণ্ডকে সম্পূর্ণ ধরিতে পারে না, ধরিতে হলে সমাধি মােক্ষ নির্বাণ ইত্যাদিই মনের উপায়, আর উপায় নাই ৷ সেই লক্ষণহীন মােক্ষলাভ এক এক জন করিতে পারে বটে কিন্তু লাভ কি? ব্রহ্ম আত্মা ভগবান ত আছেনই, ভগবান মানুষে যা চান, সেটী হচ্ছে তাহাকে এখানেই মূৰ্ত্তিমান করা ব্যষ্টিতে, সমষ্টিতে – to realise God in life ৷ পুরাতন যােগপ্রণালী অধ্যাত্ম ও জীবনের সামঞ্জস্য বা ঐক্য করিতে পারে নি, জগৎকে মায়া বা অনিত্য লীলা বলে উড়িয়ে দিয়েছে ৷ ফল হয়েছে জীবনশক্তির হ্রাস, ভারতের অবনতি ৷ গীতায় যা বলা হয়েছে, “উৎসীদেয়ুরিমে লােকা ন কুৰ্যাং কৰ্ম্ম চেদহ”, ভারতের “ইমে লােকাঃ” সত্যই সত্যই উৎসন্ন হয়ে গেছে ৷ কয়েকজন সন্ন্যাসী ও বৈরাগী সাধু সিদ্ধ মুক্ত হয়ে যাবে, কয়েকজন ভক্ত প্রেমে ভাবে আনন্দে অধীর হয়ে নৃত্য কৰ্ব্বে, আর সমস্ত জাতি প্রাণহীন বুদ্ধিহীন হয়ে ঘাের তমােভাবে ডুবে যাবে, এ কিরূপ অধ্যাত্মসিদ্ধি? আগে মানসিক level যত খণ্ড অনুভূতি পেয়ে মনকে অধ্যাত্মরসপ্লুত, অধ্যাত্মের আলােকে আলােকিত কৰ্ত্তে হয়, তাহার পর উপরে ওঠা ৷ উপরে না উঠিলে – অর্থাৎ বিজ্ঞানভূমিতে, জগতের শেষ রহস্য জানা অসম্ভব, জগতের সমস্যা solved হয় না ৷ সেখানেই আত্মা ও জগৎ, অধ্যাত্ম ও জীবন, এই দ্বন্দ্বের অবিদ্যা ঘুচে যায় ৷ তখন জগৎ আর মায়া বলে দেখতে হয় না, জগৎ ভগবানের সনাতন লীলা, আত্মার নিত্য বিকাশ ৷ তখন ভগবানকে পূর্ণভাবে জানা পাওয়া সম্ভব হয়, গীতায় যাকে বলে “সমগ্রং মাং জ্ঞাতুং প্রবিষ্ট” ৷ অন্নময় দেহ, প্রাণ, মনবুদ্ধি, বিজ্ঞান, আনন্দ এই হল আত্মার পাঁচটী ভূমি, যতই উচুতে উঠি, মানুষের spiritual evolutionএর চরম সিদ্ধির অবস্থা নিকট হয়ে আসে ৷ বিজ্ঞানে ওঠায় আনন্দে ওঠা সহজ হয়ে যায়, অখণ্ড অনন্ত আনন্দের অবস্থার স্থির প্রতিষ্ঠা হয় শুধু ত্রিকালাতীত পরব্রহ্মে নয়, দেহে জগতে জীবনে ৷ পূর্ণ সত্তা পূর্ণ চৈতন্য পূর্ণ আনন্দ বিকশিত হয়ে জীবনে মূৰ্ত্ত হয় ৷ এই চেষ্টাই আমার যােগপন্থার central clue, তার মূল কথা ৷

এইরূপ হওয়া সহজ নয়, এই পনের বৎসর পরেই আমি এইমাত্র বিজ্ঞানের তিনটী স্তরের নিম্নতম স্তরে উঠে নীচের সকল বৃত্তি তার মধ্যে টেনে তুলবার উদ্যোগে আছি ৷ তবে এই সিদ্ধি যখন পূর্ণ হবে, তখন ভগবান আমার through দিয়ে অপরকেও অল্প আয়াসে বিজ্ঞানসিদ্ধি দিবেন, এর কিছু মাত্র সন্দেহ নাই ৷ তখন আমার আসল কাজের আরম্ভ হবে ৷ আমি কৰ্ম্মসিদ্ধির জন্যে অধীর নহি ৷ যাহা হবার, ভগবানের নির্দিষ্ট সময়ে হবে, উন্মত্তের মতন ছুটে ক্ষুদ্র অহমের শক্তিতে কর্মক্ষেত্রে ঝাপ দিতে প্রবৃত্তি নাই ৷ যদি কৰ্ম্মসিদ্ধি নাও হয়, আমি ধৈৰ্য্যচ্যুত হব না, এই কৰ্ম্ম আমার নয়, ভগবানের ৷ আমি আর কারুর ডাক শুনব না, ভগবান যখন চালাবেন, তখন চলব ৷

বাঙ্গালা যে প্রস্তুত নয়, আমি জানি ৷ যে অধ্যাত্মের বন্যা এসেছে, সে হচ্ছে ৷ অনেকটা পুরাতনের নূতন রূপ কিন্তু আসল রূপান্তর নয় ৷ তবে এরও দরকার ছিল ৷ বাঙ্গালা যত পুরাতন যােগকে নিজের মধ্যে জাগিয়ে সেইগুলির সংস্কার exhaust করে আসল সারটী লয়ে জমি উর্বর কৰ্বে ৷ আগে ছিল বেদান্তের পালা, অদ্বৈতবাদ, সন্ন্যাস, শঙ্করের মায়া ইত্যাদি ৷ যাহা এখন হচ্ছে, তােমার বর্ণনা দেখে বােঝা যায়, এইবার বৈষ্ণব ধৰ্ম্মের পালা, লীলা, প্রেম, ভাবের আনন্দে মেতে যাওয়া ৷ এইগুলি অতি পুরাতন, নবযুগের অনুপযােগী, টিকতে পারে না, এইরূপ উন্মাদনা টিকবার নহে ৷ তবে বৈষ্ণব ভাবের এই গুণ আছে ৷ যে ভগবানের সঙ্গে জগতের একটী সম্বন্ধ রাখে, জীবনের একটী অর্থ হয় ৷ খণ্ডভাব বলে পূর্ণ সম্বন্ধ, পূর্ণ অর্থ নাই ৷ যে দলাদলির ভাব লক্ষ্য করেছ, সেটী অনিবাৰ্য্য ৷ মনের ধর্ম এই, খণ্ডকে লয়ে তাহাকে পূর্ণ বলা, আর সকল খণ্ডকে বহিস্কৃত করা ৷ যে সিদ্ধ ভাবটী নিয়ে আসেন, তিনি খণ্ডভাব অবলম্বন করেও পূর্ণের সন্ধান কতকটা রাখেন, মূৰ্ত্ত কৰ্ত্তে না পারিলেও; শিষ্যেরা তাহা পায় না, মূর্ত নহে বলে ৷ পুঁটলি বাঁধছে বাঁধুক, দেশে ভগবান যে দিন পূর্ণ অবতীর্ণ হবেন পুঁটলি আপনি খুলে যাবে ৷ এই সকল হচ্ছে অপূর্ণতার, কাচা অবস্থার লক্ষণ, তাতে বিচলিত হই না ৷ অধ্যাত্ম ভাব খেলুক দেশে, যে ভাবেই হৌক, যত দলেই হৌক, পরে দেখা যাবে ৷ এটী নবযুগের শৈশব, এমন কি embryonic অবস্থা ৷ আভাস মাত্র, আরম্ভ নয় ৷

তারপর মতিদের কথা ৷ মতিলাল যাহা আমার কাছে পেয়েছে, সে হয় আমার যােগের প্রথম প্রতিষ্ঠা, ভিত্তি – আত্মসমর্পণ, সমতা ইত্যাদি, তাহারই অনুশীলন করে আসছে, সম্পূর্ণ হয়নি, – এই যােগের একটী বিশিষ্টতা এই যে সিদ্ধি একটু উপরে না উঠলে ভিত্তিও পাকা হয় না ৷ এখন মতিলাল আরও উঁচুতে উঠতে চায় ৷ তার আগে অনেক পুরাতন সংস্কার ছিল, কয়েকটী খসেছে, কয়েকটী এখনও আছে ৷ আগে ছিল সন্ন্যাসের সংস্কার, অরবিন্দ মঠ কৰ্ত্তে চেয়েছিল,1এখন বুদ্ধি মেনেছে সন্ন্যাস চাই না, প্রাণে কিন্তু সেই পুরাতনের ছাপ এখন একেবারে মুছে যায় নি ৷ সে জন্যে সংসারে থেকে ত্যাগী সন্ন্যাসী হতে বলে ৷ কামনা-ত্যাগের আবশ্যকতা বুঝেছে, কামনা ত্যাগ আর আনন্দভােগের সামঞ্জস্য পূর্ণভাবে ধরিতে পারে নি ৷ আর আমার যােগটা নিয়েছিল, যেমন বাঙালীর সাধারণ স্বভাব, তেমন জ্ঞানের দিক থেকে নয়, যেমন ভক্তির দিকে, কৰ্ম্মের দিকে ৷ জ্ঞান কতকটা ফুটেছে, অনেক বাকি আছে, আর ভাবুকতার কুয়াশা dissipated হয় নি, তবে যেমন নিবিড় ছিল তেমন আর নাই ৷ সাত্ত্বিকতার গণ্ডী পুরােমাত্রায় কাটতে পারে নি, অহং এখনও রয়েছে ৷ এক কথায় তার development চলছে, পূর্ণ হয় নি ৷ আমারও কোন তাড়াতাড়ি নাই, আমি তাকে নিজের স্বভাব অনুসারে develop কৰ্তে দিচ্ছি ৷ এক ছাঁচে সকলকে ঢালতে চাই না, আসল জিনিসটী সকলের মধ্যে এক হবে, তবে নানা ভাবে নানা মূৰ্ত্তিতে ফুটবে ৷ সকলে ভিতর থেকে grow কৰ্ব্বে, বাহির থেকে গঠন কৰ্ত্তে চাই না, মতিলাল মূলটী পেয়েছে, আর সব আসবে ৷

তুমি বলছ, মতিলালও কেন পুঁটলি বাঁধছে, তার explanation এই ৷ প্রথম কথা তাহার চারিদিকে কয়েকজন লােক জুটেছে যারা তাহাকে ও আমাকে জানে, সে যা পেয়েছে আমার কাছে, তারাও পাচ্ছে ৷ তারপর আমি প্রবর্তকে “সমাজ কথা” বলে একটী ক্ষুদ্র প্রবন্ধ লিখেছিলাম, তার মধ্যে সংঘের কথা বলেছিলাম, ভেদপ্রতিষ্ঠ সমাজ চাই না, আত্মপ্রতিষ্ঠ আত্মার ঐক্যের মূৰ্ত্তি সংঘ চাই ৷ এই ideaকেই মতিলাল নিয়ে দেবসংঘ নাম বার করেছে ৷ আমি বলেছিলাম ইংরাজীতে divine lifeএর কথা, নলিনী তার অনুবাদ করে দেবজীবন, যারা দেবজীবন চায়, তাদেরই সংঘ দেবসংঘ ৷ মতিলাল সেইরূপ সংঘের বীজস্বরূপ চন্দন্নগরে স্থাপন করে দেশময় ছড়িয়ে দিবার চেষ্টা আরম্ভ করে ৷ এইরূপ চেষ্টার উপর “অহম”এর ছায়া যদি পড়ে, সংঘ দলে পরিণত হয় ৷ এই ধারণা সহজে হইতে পারে যে, যে সংঘ শেষে দেখা দিবে, এটাই তাই, সব হবে এই একমাত্র কেন্দ্রের পরিধি, যারা এর বাহিরে, তারা ভিতরকার লােক নহে, হলেও তারা ভ্রান্ত, ঠিক আমাদের যে বর্তমান ভাব, তার সঙ্গে মিলে না বলে ৷ মতিলালের এই ভুল যদি থাকে, কতকটা থাকবার কথা, – তবে আছে কিনা আমি জানি না, – বিশেষ ক্ষতি নাই, সে ভুল টিকবে না ৷ তাহার দ্বারা আর তাহার ক্ষুদ্র মণ্ডলীর দ্বারা আমাদের অনেক কাজ হয়েছে আর হচ্ছে যে আর কেহ এ পর্যন্ত কৰ্ত্তে পারে নি ৷ তার মধ্যে ভাগবত শক্তি work কচ্ছে, তার কোনও সন্দেহ নাই ৷

তুমি হয়ত বলবে সংঘেরও কি দরকার ৷ মুক্ত হয়ে সর্ব ঘটে থাকব, সব একাকার হয়ে যাক, সেই বৃহৎ একাকারের মধ্যে যা হয় ৷ সে সত্যি কথা, কিন্তু সত্যের একটী দিক মাত্র ৷ আমাদের কারবার শুধু নিরাকার আত্মা নিয়ে নয়, জীবনকেও চালাতে হবে, আকার মূৰ্ত্তি ভিন্ন জীবনের effective গতি নাই ৷ অরূপ যে মূর্ত হয়েছে, সে নামরূপ গ্রহণ মায়ার খামখেয়ালী নয়, রূপের নিতান্ত প্রয়ােজন আছে বলে রূপগ্রহণ ৷ আমরা জগতের কোনও কাৰ্য্য বাদ দিতে চাই , রাজনীতি বাণিজ্য সমাজ কাব্য শিল্পকলা সাহিত্য সবই থাকবে, এই সকলকে নূতন প্রাণ, নূতন আকার দিতে হবে ৷ রাজনীতিকে ছেড়েছি কেন? আমাদের রাজনীতি ভারতের আসল জিনিস নয় বলে, বিলাতী আমদানী, বিলাতী ঢঙের অনুকরণ মাত্র ৷ তবে তারও দরকার ছিল, আমরাও বিলাতী ধরণের রাজনীতি করেছি, না কল্লে দেশ উঠত না, আমাদেরও experience লাভ ও পূর্ণ de-velopment হত না ৷ এখনও তার দরকার আছে, বঙ্গদেশে তত নাই, যেমন ভারতের অন্য প্রদেশে ৷ কিন্তু এখন সময় এসেছে ছায়াকে বিস্তার না করে বস্তুকে ধরবার, ভারতের প্রকৃত আত্মাকে জাগিয়ে সকল কর্ম তারই অনুরূপ করা চাই ৷ এই দশ বৎসর আমার influence মৌনভাবে এই বিলাতী রাজনীতি ঘটে ঢেলেছি, ফলও হয়েছে, এখনও তাহাই কর্তে পারি যেখানে দরকার, কিন্তু যদি বাহিরে গিয়ে আবার সেই কর্মে লাগি, রাজনীতিক পাণ্ডাদের সঙ্গে মিশে কাজ করি, একটী পরধৰ্ম্মের, একটী মিথ্যা রাজনীতিক জীবনের পােষণ করা হবে ৷ লােকে এখন রাজনীতিকে spiritualise কৰ্ত্তে চায়, যেমন গান্ধী, ঠিক পথটী ধৰ্ত্তে পাচ্ছে না ৷ গান্ধী কি করছেন? অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম, jainism, হরতাল, passive resistance ইত্যাদির খিচুড়ি করে সত্যাগ্রহ বলে একরকম Indianised Tolstoyism দেশে আনছেন, ফল হবে যদি কোনও স্থায়ী ফল হয় এক রকম Indianised Bolshevism ৷তাঁহার কৰ্ম্মে আমার আপত্তি নাই, যাঁর যে প্রেরণা, তিনি তাহাই করুন ৷ তবে এটী আসল বস্তু নয় ৷ এই সকল অশুদ্ধ রূপে spiritual শক্তি ঢাল্লে, কাচা ঘটে কারণােদধির জল, হয় ওই কঁাচা জিনিসটি ভেঙ্গে যাবে, জল ছড়িয়ে নষ্ট হবে, নয় অধ্যাত্ম শক্তি evaporate করে, সেই অশুদ্ধ রূপই থাকবে ৷ সর্বক্ষেত্রে তাই ৷Spiritual influence চালাতে পারি, লােকে তাহা নিয়ে জোর পেয়ে কাজ কৰ্ব্বে খুব energyর সহিত, তবে সেই শক্তি expanded হবে শিবমন্দিরে বানরের মূর্তি গড়ে স্থাপন কৰ্ত্তে ৷ বানরটী প্রাণপ্রতিষ্ঠায় শক্তিমান হয়ে ভক্ত হনুমান সেজে রামের অনেক কাজ হয় ত কৰ্ব্বে যতদিন সেই প্রাণ, সেই শক্তি থাকবে ৷ আমরা কিন্তু ভারতমন্দিরে চাই হনুমান নয়, দেবতা, অবতার, স্বয়ং রাম ৷

সকলের সঙ্গে মিশতে পারি কিন্তু সমস্তকে প্রকৃত পথে টানবার জন্যে, আমাদের আদর্শের spirit ও রূপকে অক্ষুন্ন রেখে ৷ তাহা না কল্লে দিশেহারা হব, প্রকৃত কৰ্ম্ম হবে না ৷Individually সর্বত্র থেকে কিছু হবে বটে, সংঘরূপে সর্বত্র থেকে তার শতগুণ হয় ৷ তবে এখনও সে সময় আসে নি ৷ তাড়াতাড়ি রূপ দিতে গেলে ঠিক যাহা চাই, তাহা হবে না ৷ সংঘ হবে প্রথম চড়ান রূপ; যারা আদর্শ পেয়েছে, তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নানাস্থানে কাজ কৰ্ব্বে, পরে spiritual communeর মত রূপ দিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে সব কৰ্ম্মকে আত্মানুরূপ যুগানুরূপ আকৃতি দিবে, পুরাতন আৰ্যসমাজের মত শক্ত বাঁধা রূপ নয়, অচলায়তন নয়, স্বাধীন রূপ, সমুদ্রের মতন ছড়িয়ে যেতে পারে, নানা ভঙ্গী লয়ে এটীকে ঘিরে ওটীকে প্লাবিত করে সবকে আত্মসাৎ কৰ্ব্বে, করিতে করিতে spiritual community দাড়াবে ৷ এটাই হচ্ছে আমার বর্তমান idea, এখনও পুরাে developed হয় নি ৷ আলিপরে ধ্যানে যা এসেছে, তাই developed হচ্চে, শেষে কি দাড়াবে পরে দেখব ৷ ফলটা ভগবানের হাতে, তিনি যা করান ৷ মতিলালের ক্ষুদ্র লােকসংহতি একটী experi-ment মাত্র, দেখছে সংঘবদ্ধ হয়ে বাণিজ্য industry চাষ ইত্যাদি কব্বার উপায় ৷ আমি শক্তি দিচ্ছি, watch কচিঁ, ভবিষ্যতের মালমশলা আর useful suggestionএর মধ্যে থাকতে পারে ৷ এখনকার দোষগুণ ও limitation দেখে judge করাে না ৷ এই সকলের এখন নিতান্তই initial ও experimental অবস্থা ৷

তারপর তােমার পত্রের কয়েকটী বিশেষ কথার আলােচনা করি ৷ তােমার যােগের সম্বন্ধে যা লিখেছ, সেই সম্বন্ধে এই পত্রে বিশেষ কিছু লিখতে চাই না, দেখা হলে সুবিধে হবে ৷ তবে এক কথা লিখেছ, মানুষের সঙ্গে দেহ সম্বন্ধ নাই, তােমার চোখে দেহ শব ৷ অথচ মন টানছে সংসার কৰ্ত্তে ৷ সেই অবস্থা এখনও কি আছে? দেহকে শব দেখা সন্ন্যাসের, নিৰ্বাণপথের লক্ষণ ৷ ওই ভাব নিয়ে সংসার করা যায় না ৷ সৰ্ববস্তুতে আনন্দ চাই, যেমন আত্মায় তেমন দেহে ৷ দেহ চৈতন্যময়, দেহ ভগবানের রূপ ৷ যাহা আছে জগতে, তাহাতে ভগবানকে দেখি, সৰ্ব্বমিদং ব্রহ্ম, বাসুদেবঃ সৰ্ব্বমিতি, এই দর্শন পেলে বিশ্বানন্দ হয়, শরীরেও সেই আনন্দের মূৰ্ত্ত তরঙ্গ ছুটে, এই অবস্থায় অধ্যাত্মভাবে পূর্ণ হয়ে সংসার বিবাহ সবই করা যায়, সকল কর্মে পাওয়া যায় ভগবানের আনন্দময় বিকাশ ৷ অনেক দিন থেকে মানসিক ভূমিতেও মনের, ইন্দ্রিয়ের সকল বিষয় ও অনুভূতি আনন্দময় করে তুলেছি, এখন সেই সব বিজ্ঞানানন্দের রূপ ধারণ কচ্ছে ৷ এই অবস্থায়ই সচ্চিদানন্দের পূর্ণ দর্শন ও অনুভূতি ৷

তারপর দেবসংঘের কথা বলে তুমি লিখেছ, – “আমি দেবতা নই, অনেক পিটিয়ে শানান লােহা ৷” দেবসংঘের প্রকৃত অর্থ আমি বলে দিয়েছি ৷ দেবতা কেহই নয়, তবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে দেবতা আছে, তাকেই প্রকট করা দেবজীবনের লক্ষ্য ৷ তা সকলে কর্ডে পারে ৷ বড় আধার, ক্ষুদ্র আধার আছে মানি ৷ তােমার নিজের সম্বন্ধে সে বর্ণনাকে আমি accurate বলে গ্রহণ ক%ি না ৷ তবে যেরূপ আধারই হৌক, একবার ভগবানের স্পর্শ যদি পড়ে, আত্মা যদি জাগ্রত হয়, তারপর বড় ছােট এ সবেতে বিশেষ কিছু আসে যায় না ৷ বেশী বাধা হতে পারে, বেশী সময় লাগতে পারে, বিকাশের তারতম্য হতে পারে, তারও কিছু ঠিক নাই ৷ ভিতরের দেবতা সে সব বাধা ন্যূনতার হিসাব রাখে না, ঠেলে ওঠে ৷ আমারও কি কম দোষ ছিল মনের চিত্তের প্রাণের দেহের, বা কম বাধা? সময় কি লাগে নি? ভগবান কি কম পিটিয়েছেন দিনের পর দিন, মুহূর্তের পরে মুহুর্ত? দেবতা হয়েছি বা কি হয়েছি, জানি না, তবে কিছু হয়েছি বা হচ্ছি ভগবান যা গড়তে চেয়েছেন – তাহাই যথেষ্ট ৷ সকলেরও তাই ৷ আমাদের শক্তি নয়, ভগবানের শক্তি এই যােগের সাধক ৷

নারায়ণের ভার নিয়েছ ভাল হয়েছে ৷ নারায়ণ আরম্ভ করেছিল বেশ, তারপর নিজের চারিদিকে ক্ষুদ্র সাম্প্রদায়িক গণ্ডী টেনে, দলাদলির ভাব পােষণ করে পচতে আরম্ভ করে ৷ নলিনী প্রথম নারায়ণে লিখত, তারপর স্বাধীন মতের অবকাশ পেয়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়েছে ৷ খােলা ঘরের মুক্ত হাওয়া চাই, তা না হলে জীবনশক্তি থাকবে কেন, মুক্ত আলাে মুক্ত বাতাস প্রাণশক্তির প্রথম আহার ৷ আমার লেখা দেওয়া এখন অসম্ভব, পরে দিতে পারি, তবে প্রবৰ্ত্তকেরও claim আছে আমার উপর, দুদিকের call satisfy করা প্রথম একটু কঠিন হতে পারে ৷ দেখা যাবে যখন বাঙ্গালা লিখতে আরম্ভ কৰ্ব্ব, এখন সময়ের অভাব ৷ “আৰ্য্য” ছাড়া আর কিছু লেখা অসম্ভব, প্রতি মাসে 64 pages আমাকেই যােগাতে হয়, সে কম খাটুনি নয় ৷ তারপর আছে কবিতা লেখা, যােগসাধনের সময় চাই, বিশ্রামের সময়ও চাই ৷ “সমাজ কথা” – যাহা সৌরিনের কাছে রয়েছে তাহার অধিকাংশ বােধ হয় প্রবৰ্ত্তকে বেরিয়েছে ৷ আর তার কাছে যাহা আছে, সেটা হয় ৷ ত অশুদ্ধ, শেষ সংস্কার হয় নি ৷ আগে আমি দেখি সেটা কি, তার পরে নারায়ণে বেরুতে পাবে কি না, দেখা যাবে ৷

প্রবৰ্ত্তকের কথা লিখেছ, লােকে বুঝে না, সে misty, হেঁয়ালি, এই অভিযােগ বাবর শুনে আসছি ৷ স্বীকার করি মতিবাবুর লেখায় তত clear-cut চিন্তা নাই, বড় ঘনিয়ে লেখে ৷ তবে প্রেরণা, শক্তি, power আছে ৷ নলিনী ও মণিই ছিল আগে প্রবর্তকের লেখক, তখনও লােকে বলত হেঁয়ালি ৷ অথচ নলিনীর clear-cut চিন্তা আছে, মণির লেখা direct ও শক্তিপূর্ণ ৷Aryaর সম্বন্ধেও সেই একই নালিশ, লােকে বুঝতে পারে না, এত ভেবে চিন্তে কে পড়তে চায়? তাহা সত্ত্বেও প্রবর্তক বঙ্গদেশে ঢের কাজ করে এসেছে, আর তখন লােকের ধারণা ছিল না যে আমি প্রবৰ্ত্তকে লিখি ৷ এখন যদি সেইরূপ effect হয় না, তার কারণ এই হবে যে লােকে এখন কাজের দিকে, উন্মাদনার দিকে ছুটেছে ৷ একদিকে ভক্তির বন্যা, অপরদিকে ধনােপার্জনের চেষ্টা ৷ কিন্তু বাঙ্গালাদেশ যখন দশ বৎসর ধরে অসাড় নিস্পন্দ ছিল, প্রবর্তকই ছিল একমাত্র শক্তির উৎস, বাঙ্গালার ভাব বদলাতে অনেক সাহায্য করেছে ৷ আমার বােধ হয় না যে এর মধ্যে তার কাজ শেষ হয়ে গেছে ৷

এই সম্বন্ধে আমি যা অনেক দিন থেকে দেখছি তার দুয়েকটী কথা সংক্ষেপে বলি ৷ আমার এ ধারণা হয় যে ভারতের প্রধান দৰ্ব্বলতার কারণ পরাধীনতা নয়, দারিদ্র্য নয়, অধ্যাত্মবােধের বা ধর্মের অভাব নয়, কিন্তু চিন্তাশক্তির হ্রাস, জ্ঞানের জন্মভূমিতে অজ্ঞানের বিস্তার ৷ সর্বত্রই দেখি inability or unwilling-_ness to think, চিন্তা কব্বার অক্ষমতা বা চিন্তা“ফোবিয়া” ৷ মধ্যযুগে যাই হৌক, এখন কিন্তু এই ভাবটী ঘাের অবনতির লক্ষণ ৷ মধ্যযুগে ছিল রাত্রীকাল, অজ্ঞানীর জয়ের দিন, আধুনিক জগতে জ্ঞানীর জয়ের যুগ, যে বেশী চিন্তা করে অন্বেষণ করে পরিশ্রম করে বিশ্বের সত্য তলিয়ে শিখতে পারে তার তত শক্তি বাড়ে ৷ য়ুরােপ দেখ, দেখবে দুটী জিনিষ, অনন্ত বিশাল চিন্তার সমুদ্র আর প্রকাণ্ড বেগবতী অথচ সুশৃঙ্খল শক্তির খেলা ৷ য়ুরােপের সমস্ত শক্তি সেখানে, এই শক্তির বলে জগৎকে গ্রাস কৰ্ত্তে পাচেঁ আমাদের পুরাকালের তপস্বীর মত যাদের প্রভাবে বিশ্বের দেবতারাও ভীত সন্দিগ্ধ বশীভূত ৷ লােকে বলে য়ুরােপ ধ্বংসের মুখে ধাবিত ৷ আমি তাহা মনে করি না ৷ এই যে বিপ্লব, এই যে ওলটপালট, সে নবসৃষ্টির পর্বাবস্থা ৷ তারপর ভারত দেখ ৷ কয়েকজন solitary giant ছাড়া সর্বত্রই তােমার সে সােজা মানুষ অর্থাৎ average man যে চিন্তা কর্তে চায় না, পারে না, যার বিন্দুমাত্র শক্তি নাই, আছে কেবল ক্ষণিক উত্তেজনা ৷ ভারতে চায় সরল চিন্তা, সােজা কথা, য়ুরােপে চায় গভীর চিন্তা গভীর কথা ৷ সামান্য কুলীমজুরও চিন্তা করে, সব জানতে চায় মােটামুটি জেনেও সন্তুষ্ট নয়, তলিয়ে দেখতে চায় ৷ প্রভেদ এই ৷ তবে য়ুরােপের শক্তি ও চিন্তার fatal limitation আছে ৷ অধ্যাত্মক্ষেত্রে এসে তার চিন্তাশক্তি আর চলে না ৷ সেখানে যারােপ সব দেখে হেঁয়ালি, nebulous metaphysics, yogic hallucination, “ খোঁয়ার চোখ রগড়ে কিছু ঠাহর করতে পারে না ৷ তবে এখন এই limitationও sur mount কব্বার য়ুরােপে কম চেষ্টা হচ্ছে না ৷ আমাদের অধ্যাত্মবােধ আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের গুণে, আর যার সেই বােধ আছে তার হাতের কাছে রয়েছে এমন জ্ঞান, এমন শক্তি যার এক ফুৎকারে য়ুরােপের সমস্ত প্রকাণ্ড শক্তি তৃণের মতন উড়ে যেতে পারে ৷ কিন্তু সে শক্তি পাবার জন্যে শক্তির দরকার ৷ আমরা কিন্তু শক্তির উপাসক নই, সহজের উপাসক, সহজে শক্তি পাওয়া যায় না ৷ আমাদের পূৰ্বপুরুষরা বিশাল চিন্তার সমুদ্রে সাঁতার দিয়া বিশাল জ্ঞান পেয়েছিল, বিশাল সভ্যতা দাড় করিয়ে দিয়েছিল ৷ তারা পথে যেতে যেতে অবসাদ এসে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, চিন্তার বেগ কমে গেল, সঙ্গে সঙ্গে শক্তির বেগও কমে গেল ৷ আমাদের সভ্যতা হয়ে গেছে অচলায়তন, ধৰ্ম্ম বাহ্যের গোঁড়ামি, অধ্যাত্মভাব একটী ক্ষীণ আলােক বা ক্ষণিক উন্মাদনার তরঙ্গ ৷ এই অবস্থা যতদিন থাকিবে, ভারতের স্থায়ী পুনরুত্থান অসম্ভব ৷

বাঙ্গালাদেশেই এই দুর্বলতার চরম অবস্থা ৷ বাঙ্গালীর ক্ষিপ্রবুদ্ধি আছে, ভাবের capacity আছে, intuition আছে, এই সব গুণে সে ভারতে শ্রেষ্ঠ ৷ এই সকল গুণই চাই, কিন্তু এগুলি যথেষ্ট নহে ৷ এর সঙ্গে যদি চিন্তার গভীরতা, বীর শক্তি, বীরােচিত সাহস, দীর্ঘ পরিশ্রমের আনন্দ ও ক্ষমতা যােটে, তা হলে বাঙ্গালী ভারতের কেন, জগতের নেতা হয়ে যাবে ৷ কিন্তু বাঙ্গালী তা চায় না, সহজে সারতে চায়, চিন্তা না করে জ্ঞান, পরিশ্রম না করে ফল, সহজ সাধনা করে ৷ সিদ্ধি ৷ তার সম্বল আছে ভাবের উত্তেজনা, কিন্তু জ্ঞানশূন্য ভাবাতিশয্যই হচ্ছে এই রােগের লক্ষণ ৷ চৈতন্যের সময় থেকে, তার অনেক আগে থেকেও বাঙ্গালী কি কচ্ছে? অধ্যাত্ম সত্যের কোন সহজ মােটামুটি কথা ধরে ভাবের তরঙ্গে কয়েক দিন নেচে বেড়ায়, তারপরে অবসাদ, তমােভাব ৷ এদিকে দেশের ক্রমশ অবনতি, জীবনশক্তি হ্রাস হয়েছে, শেষে বাঙ্গালী নিজের দেশে কি হয়েছে, খেতে পাচ্চে না, পরবার কাপড় পাচ্ছে না, চারিদিকে হাহাকার, ধনদৌলত ব্যবসাবাণিজ্য জমী চাষ পৰ্য্যন্ত আস্তে আস্তে পরের হাতে যেতে আরম্ভ কচ্ছে ৷ শক্তি সাধনা ছেড়ে দিয়েছি, শক্তিও আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন ৷ প্রেমকে সাধনা করি, কিন্তু যেখানে জ্ঞান ও শক্তি নাই, প্রেমও থাকে না, সঙ্কীর্ণতা ক্ষুদ্রতা আসে, ক্ষুদ্র সঙ্কীর্ণ মনে প্রাণে হৃদয়ে প্রেমের স্থান নাই ৷ প্রেম কোথায় বঙ্গদেশে? যত ঝগড়া মনােমালিন্য ঈর্ষা ঘৃণা দলাদলি বঙ্গদেশে আছে, ভেদক্লিষ্ট ভারতেও আর কোথাও তত নাই ৷ আৰ্যজাতির উদার বীরযুগে এত হাঁকডাক নাচানাচি ছিল না, কিন্তু যে চেষ্টা আরম্ভ করত ওরা, সে বহু শতাব্দী ধরে স্থায়ী থাকত ৷ বাঙ্গালীর চেষ্টা দুদিন স্থায়ী থাকে ৷ তুমি বলচ চাই ভাব উন্মাদনা দেশকে মাতান ৷ রাজনীতিক্ষেত্রে ওসব করেছিলাম স্বদেশীর সময়ে, যা করেছিলাম সব ধূলিসাৎ হয়েছে ৷ অধ্যাত্মক্ষেত্রে কি শুভতর পরিণাম হবে? আমি বলছি না যে কোনও ফল হয়নি ৷ হয়েছে, যত movement হয়, তার কিছু ফল হয়ে দাঁড়াবে, তবে সে অধিকাংশ possibilityর বৃদ্ধি, স্থিরভাবে actualise কব্বার এটী ঠিক রীতি নয় ৷ সেই জন্যে আমি আর emotional excitement, ভাব, মনমাতানােকে base কর্তে চাই না ৷ আমি আমার যােগের প্রতিষ্ঠা কন্ট্রে চাই বিশাল বীর সমতা, সেই সময় প্রতিষ্ঠিত আধারের সকল বৃত্তিতে পূর্ণ দৃঢ় অবিচলিত শক্তি, শক্তিসমুদ্রে জ্ঞানসূর্যের রশ্মির বিস্তার, সেই আলােকময় বিস্তারে অনন্ত প্রেম আনন্দ ঐক্যের স্থির ecstasy ৷ লাখ লাখ শিষ্য চাই না, একশ ক্ষুদ্র-আমিত্বশূন্য পুরাে মানুষ ভগবানের যন্ত্ররূপে যদি পাই, তাহাই যথেষ্ট ৷ প্রচলিত গুরুগিরির উপর আমার আস্থা নাই, আমি গুরু হতে চাই না, আমার স্পর্শে জেগে হৌক, অপরের স্পর্শে জেগে হৌক ৷ কেহ যদি ভিতর থেকে নিজের সুপ্ত দেবত্ব প্রকাশ করে ভাগবত জীবন লাভ করে, এটাই আমি চাই ৷ এইরূপ মানুষই এই দেশকে তুলবে

এই lecture পড়ে এই কথা ভাববে না যে আমি বঙ্গদেশের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নিরাশ ৷ ওঁরা যা বলেন যে বঙ্গদেশেই এবার মহাজ্যোতির বিকাশ হবে, আমিও সেই আশা কর্চি ৷ তবে other side of the shield, কোথায় দোষ ক্ষতি ন্যুনতা তাহা দেখাবার চেষ্টা করেছি ৷ এইগুলি থাকলে সে জ্যোতি মহাজ্যোতিও হবে না, স্থায়ীও হবে না ৷ যত সাধু মহাপুরুষদের কথা লিখেছ, ওসব আমার কেমন কেমন ঠেকে, যেন যা চাই, এর মধ্যে তা পাচ্ছি না ৷ দয়ানন্দের অদ্ভুত সব সিদ্ধি আছে, আশ্চৰ্য্য automatic writing হয় তার নিরক্ষর শিষ্যদের ৷ ভাল কথা, কিন্তু এটী হচ্ছে psychic faculty মাত্র ৷ তাদের মধ্যে আসল বস্তু কি ও কতদূর এগিয়েছে, তাই জানতে চাই ৷ আর একজন লােককে স্পর্শ করে মাতিয়ে দেয় ৷ বেশ কথা, কিন্তু সে মাতানাের ফল কি; সে লােকটী কি সেই ধরণের মানুষ হয় যে নবযুগের, ভাগবত সত্যযুগের স্তম্ভরূপ হয়ে দাঁড়াতে পারে, এই প্রশ্ন ৷ দেখছি তােমার সে সম্বন্ধে সন্দেহ আছে, – আমারও আছে ৷

র ভবিষ্যদ্বাণী পড়ে আমার হাসি পেয়েছিল, অবজ্ঞার অবিশ্বাসের হাসি নয়, —দূর ভবিষ্যতের কথা আমি জানি না, ভগবান আমাকে যে আলােক দেন মাঝে মাঝে, তাহা আমার এক পা আগে পড়ে, সেই আলােকে আমি চলি ৷ তবে আমি ভাবছি, এঁরা আমাকে চান কেন, সে মহাসম্মিলনে আমার স্থান কি? আশঙ্কা আমাকে দেখে তারা নিরাশ না হন, আমিও fish out of the water হই ৷ আমি ত সন্ন্যাসী নই, সাধুও নই, সন্তও নই, ধাৰ্মিক পৰ্য্যন্তও নই, আমার ধর্ম নাই, আচার নাই, সাত্ত্বিকতা নাই, আমি ঘাের সংসারী, বিলাসী, মাংসভােজী, মদ্যপায়ী, অশ্লীলভাষী, যথেচ্ছাচারী, বামমার্গের তান্ত্রিক ৷ এই সকল মহাপুরুষ ও অবতারদের মধ্যে আমিও কি একজন মহাপুরুষ ও অবতার? আমাকে দেখে হয় তাে ভাববেন কলির অবতার বা আসুর রাক্ষসী কালীর, খৃষ্টানরা যাকে Antichrist বলে! আমার সম্বন্ধে দেখছি একটী ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়ে গেছে, লােকে যদি disappointed হয়, তার জন্যে আমি দায়ী নহি ৷

এই অসাধারণ লম্বা চিঠির তাৎপৰ্য্য এই যে আমিও পুঁটলি বাঁধছি ৷ তবে আমার বিশ্বাস যে সে পটলি St. Peterএর চাদরের মত, অনন্তের যত শিকার তার মধ্যে গিজগিজ কচ্ছে ৷ এখন পুঁটলি খুলছি না ৷ অসময়ে খুলতে গেলে শিকার পালাতে পারে ৷ দেশেও এখন যাচ্ছি না, দেশ তৈরি হয় নি বলে নয়, আমি তৈয়ারি হয় নি বলে ৷ অপক্ক অপর্কের মধ্যে গিয়ে কি কাজ কর্তে পারে?

তােমার

সেজদাদা


পুনশ্চ – নলিনী লিখেছে তােমরা এপ্রিলের শেষে আসবে না, মে মাসে ৷ উপেনও আসবার কথা লিখেছিলে, তার কি হল? সে কি তােমাদের কাছে রয়েছে না অন্যত্র? মুকুন্দীলাল আমার কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন সরােজিনীর ঠিকানায় দিবার জন্যে, কিন্তু সরােজিনী কোথায় আমি জানি না, সেজন্য তােমার কাছে পাঠাচ্ছি ৷ তুমি forward করাে ৷

মতিলালের চিঠি পেয়েছি, তাতে ও আর কয়েকটী circumstanceএ বুঝলাম তার আর সৌরিনের মধ্যে misunderstandingএর ছায়া পড়ছে, সে মনােমালিন্যে পরিণত হতে পারে ৷ আমাদের মধ্যে এরূপ হওয়া নিতান্ত অনুচিত ৷ মতিলালকে এ সম্বন্ধে লিখব, তুমি সৌরিনকে বল, যেন সাবধান হয় যে এরূপ breach বা riftএরও লেশমাত্র কারণ না ঘটে ৷ কে মতিলালকে বলেছে যে সৌরিন লােককে জানাচ্ছে (impression দিচ্ছে) যে প্রবৰ্ত্তকের সঙ্গে অরবিন্দ ঘােষের কোন সম্বন্ধ নাই ৷ এইরূপ কথা নিশ্চয় সৌরিন বলে নি, কারণ প্রবর্তক আমাদেরই কাগজ, আমি স্বহস্তে লিখি বা না লিখি, আমারই through দিয়ে ভগবান মতিলালকে শক্তি দিয়ে লেখাচ্ছেন, spiritual হিসেবে আমারই লেখা, মতিলাল তার মনের রং দেয় মাত্র ৷ হয় ত সৌরিন বলেছে প্রবর্তকের প্রবন্ধ ওঁর নিজের লেখা নয়, তাও বলা দরকার নাই, তাতে লােকের মনে উলটো wrong im-pression হতে পারে ৷ প্রবৰ্ত্তকে কে লেখে না লেখে সে কথা অনেকটা গােপন করে রেখেছি, – প্রবৰ্ত্তকে প্রবর্তকই লেখে, শক্তিই লেখে, সে কোন বিশেষ ব্যক্তির সৃষ্টি নয়, আর এটী সত্যই কথা ৷ দেবজন্ম ইত্যাদি নলিনী মণির প্রবন্ধ বইর আকারে বেরিয়েছে, তাহাতেও নাম দেওয়া হয়নি, সেই একই principleএ ৷ তাহাই থাক্ until further order ৷









Let us co-create the website.

Share your feedback. Help us improve. Or ask a question.

Image Description
Connect for updates